ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-২৪)

শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমায়ের জীবনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত এই ধারাবাহিকটি ইতিমধ্যে পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। আমাদের বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠকমণ্ডলীর মধ্যে শ্রী অরবিন্দ ও মায়ের জীবনী নিয়ে চর্চা করেন কিংবা শ্রী অরবিন্দ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত পাঠকও রয়েছেন নিশ্চয়ই। তাঁদের প্রতি আমাদের বিনম্র আবেদন যে, ধারাবাহিকটি পড়তে পড়তে কোনোরকম তথ্যভিত্তিক ত্রুটি চোখে পড়লে অনুগ্রহ করে তৎক্ষণাৎ আমাদের দপ্তরে যোগাযোগ করুন, অথবা লেখার শেষে কমেন্টেও জানাতে পারেন। এছাড়া লেখার নীচে দেওয়া লেখকের ফোন নম্বরে সরাসরি করতে পারেন যোগাযোগ। আমরা ত্রুটি মেরামতে সদা সচেষ্ট। –সম্পাদক

মুকুল কুমার সাহা: ‘চেতনার অবতরণ’ এর জ পর্বে ও তার আগের পর্বগুলি থেকে আমরা জানতে পেরেছি, জড়ে যখন প্রাণশক্তি নেমে এসেছে, তখন থেকেই ব্যষ্টির সূচনা হয়েছে। প্রাণীর মধ্যে এসে ব্যষ্টিত্ব স্পষ্ট দেখা দিয়েছে। প্রথমে সৃষ্টির নিম্নভূমিতে শুধুই জড় ছিল, জড় ও প্রাণের মিলনে প্রথমে ছোট ছোট আকার নিয়ে ব্যষ্টির সূচনা হয়। বিবর্তনের পদ্ধতিতে ক্রমে ক্রমে উন্নততর প্রাণীর সৃষ্টি হয়। সবশেষে জড়, প্রাণশক্তি ও মনশক্তির মিলনে মানুষ সৃষ্টি হয়। মানুষের অন্তর্হৃদয়ে যখন আর একটি সত্য চৈতন্য ও আনন্দের অবতরণ ঘটে, ফলে ব্যক্তিত্বের সূচনা হয় মানুষের মধ্যে। শ্রীঅরবিন্দ যার নাম দিয়েছেন ‘চৈত্য পুরুষ’। খুব সম্ভব, শ্রীরামকৃষ্ণদেব যাকে বলতেন আমাদের ‘পাকা আমি’। মানুষের আগে পর্যন্ত যে ব্যষ্টিত্ব দেখা দিয়েছে ক্রমে পরিপুষ্ট হয়েছে, তার উদ্দেশ্য হল এমন একটি কাঠামো তৈরি করা যার মধ্যে ব্যক্তিত্ব ধরা দিতে পারে, তার কাজ করতে পারে।

ভগবানের যে শক্তিকে প্রকৃতি বলা হয়, তার দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফল এই মানুষ নামক জীবটি। এই মানুষ নামক জীবের মধ্যেই ভগবানের এই বিশেষ শক্তি চৈতন্য অবতরণ করেছে; যার ফলে মানুষের মধ্যে ব্যক্তিত্ব দেখা দিয়েছে। এর পরের চেতনার অবতরণের পর্বগুলিতে এ ব্যাপারে বিশদে জানতে পারব আমাদের অন্তর্হৃদয়ে ভগবানের কোন শক্তি অবতরণ করেছে যা জড় জগতের অন্য কোনো জীবের মধ্যে নেই। এমন কি, মনোময় জগতের অসুর, প্রাণময় জগতের যক্ষ-রক্ষেরও এই অন্তর্হৃদয় নেই। মানুষের মধ্যে ভগবানের যে বিশেষ শক্তি অবতরণ করেছে যার ফলে মানুষ সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছাকৃত ভাবে রূপান্তরের যোগ্যতা অর্জন করেছে।

চেতনার অবতরণ পর্ব (ঝ)

মানুষের অন্তর্হৃদয়ে অবতরণ হয়েছে, কিন্তু অবতরণ করেছে কে, কে অবতারী? সে নিজেও নিশ্চয়ই এক ব্যক্তিস্বত্তা, কারণ তারই অবতরণে মানুষের ব্যক্তিসত্তা। সে আর কেউ নয়, সে হল “জীবাত্মা”। জীবাত্মা কাকে বলি? ভগবানের আপন সচ্চিদানন্দময় আনন্ত‍্যে ফুটে উঠেছে ভগবানের সচ্চিদানন্দময় শান্ত তরঙ্গ বা অংশ সব– এমন সব কেন্দ্র, এমন সব বিন্দু যেখানে ভগবান এক একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়ে সসীম ও সুসীম হয়ে (আনন্ত‍্যের সঙ্গে পূর্ণ সাক্ষাৎ সংযোগ ও একত্ব অক্ষুণ্ন রেখেই) দেখা দিয়েছে, সম্মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। এইসব কেন্দ্রবিন্দু অংশ হল জীব বা জীবাত্মা। তবে জীবাত্মারা সৃষ্টিলীলার বাহিরে– তারা ভগবানের পরা প্রকৃতির রূপায়ণ, তারা সনাতন অক্ষয় অব্যয়। মানুষের মধ্যে এই জীব অবতরণ করেছে হৃদয়পুরুষ চৈত্যপুরুষ অন্তরাত্মা হয়ে। সৃষ্টির বিবর্তন ধারার বাহিরে যা হল জীব, বিবর্তনের মধ্যে মানুষে তার প্রতিরূপ প্রতিচ্ছায়া হল হৃদপুরুষ। জীবাত্মার অবতরণ, হৃদপুরুষের আবির্ভাব হয় মানুষকে তার নিম্নতন প্রকৃতি হতে ঊর্ধ্বতর অধ্যাত্ম চেতনায় তুলে ধরবার জন্য, তার প্রকৃতিকে পরিবর্তিত রূপান্তরিত করবার জন্য। এই হৃদপুরুষই অন্তর্যামী হয়ে, আন্তর ঈশ্বর হয়ে মানুষের আধারকে প্রাকৃত দেহ-প্রাণ-মনকে ধারণ করে নিয়ন্ত্রিত করে আধেয়রূপে আপন নিভৃত ও নৈসর্গিক ভাগবত জ্যোতির প্রভাবে ও চাপে আধারকে ক্রমে পরিশুদ্ধ ও পরিবর্তিত করে চলে।

এই অন্তর্হৃদয় বা চৈত্যপুরুষ তাহলে দেখছি এক দিক দিয়ে মানুষকে তার আদি মূল যে ভাগবত সচিদানন্দময় স্থিতি সেই দিকে উন্মুখী ও উন্মুক্ত রেখেছে। আর এক দিক দিয়ে মানুষের সমগ্র প্রাকৃত সত্তাকে ধারণ করেছে, ভরণ করেছে, শোধন করেছে। চৈত্যপুরুষের স্বরূপ হল এই যে সে দেহ প্রাণ মনের ভাগবত অধিষ্ঠাতা এবং তার স্বাভাবিক ধর্ম ও কর্ম হল আপনার চেতনার দিব্য তেজে মনকে প্রাণকে দেহকে অজ্ঞানের ধর্মকর্ম হতে ক্রমে মুক্ত করে জ্ঞানের ধর্ম-কর্মে প্রতিষ্ঠিত করা। এই চৈত্যপুরুষকে আশ্রয় করেই মানুষের সত্যকার ব্যক্তিরূপ– বাহিরে যে ব্যক্তিরূপ দেখি, যা মন-প্রাণ-দেহের একটা বিশেষ গঠন, তা এই সত্যকার ব্যক্তিরূপের ছায়া, প্রতিধ্বনি, অনেক সময় বিকৃতি। এই চৈত্যপুরুষের ক্রমবর্ধমান প্রকাশের ফলেই মানুষের ব্যক্তিরূপও ক্রমে পরিশুদ্ধ পরিস্ফুট হয়ে ওঠে, অবশেষে লাভ করে ভাগবত ব্যক্তিত্ব।

(পঞ্চবিংশ পর্ব আগামী রবিবার)

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন- 8584063724

২৩ম পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন- https://agamikalarab.com/2020/04/21

One thought on “ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-২৪)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s