ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-২৭)

শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমায়ের জীবনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত এই ধারাবাহিকটি ইতিমধ্যে পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। আমাদের বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠকমণ্ডলীর মধ্যে শ্রী অরবিন্দ ও মায়ের জীবনী নিয়ে চর্চা করেন কিংবা শ্রী অরবিন্দ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত পাঠকও রয়েছেন নিশ্চয়ই। তাঁদের প্রতি আমাদের বিনম্র আবেদন যে, ধারাবাহিকটি পড়তে পড়তে কোনোরকম তথ্যভিত্তিক ত্রুটি চোখে পড়লে অনুগ্রহ করে তৎক্ষণাৎ আমাদের দপ্তরে যোগাযোগ করুন, অথবা লেখার শেষে কমেন্টেও জানাতে পারেন। এছাড়া লেখার নীচে দেওয়া লেখকের ফোন নম্বরে সরাসরি করতে পারেন যোগাযোগ। আমরা ত্রুটি মেরামতে সদা সচেষ্ট। –সম্পাদক

প্রকৃতিতে মানুষ

মুকুল কুমার সাহা: ‘চেতনার অবতরণ’ এর শেষ পর্বে আমরা জানতে পেরেছি সচ্চিদানন্দময় পুরুষোত্তমের নিজের অবতরণ সম্বন্ধে। পূর্ণ ভগবান দেহধারী ব্যক্তি রূপ নিয়ে অবতীর্ণ হন একটা রূপান্তর সাধনের জন্য। তিনি পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে নিজে দেখিয়ে দেন কীভাবে প্রকৃতির রূপান্তর সাধন করতে হয় এবং কীভাবে নিম্নতন চেতনা থেকে ঊর্ধ্বতর চেতনাস্তরে উন্নীত হতে হয়। তাঁর দেহশক্তি প্রকৃতির প্রাকৃত দেহশক্তিকে বাধ্য করে তাঁকে ঊর্ধ্বায়িত ও রূপান্তরিত করতে।

চেতনার অবতরণ পর্বটি আমাদের বুঝতে সাহায্য করেছে ঊর্ধ্ব হতে কীভাবে সচ্চিদানন্দের বিভিন্ন ধরণের অবতরণের ফলে সৃষ্টি হয়েছে ও হয়ে চলেছে। সচ্চিদানন্দের বিভিন্ন সৃষ্টির মধ্যে এক ধরণের সৃষ্টিতে আমরা মানুষ। জড় সৃষ্টির মধ্য থেকে আমরা পেয়েছি আমাদের জড় দেহ। সূক্ষ্ম প্রাণশক্তি থেকে আমরা পেয়েছি আমাদের প্রাণশক্তি বা জীবনীশক্তিকে। সূক্ষ্ম মনোময় শক্তি থেকে আমরা পেয়েছি আমাদের মনকে। জড়, প্রাণ, মন এই তিন শক্তি হচ্ছে ভগবানের নিম্ন শক্তি, যাকে বলা হয় অপরা প্রকৃতি। ভগবানের আর এক প্রকৃতি আছে, যাকে বলা হয় পরা প্রকৃতি। পরা প্রকৃতি হচ্ছে অনাদি ভগবানের অনন্ত কালাতীত চিৎশক্তি। ভগবানের ঊর্ধ্ব প্রকৃতি বা পরা প্রকৃতি হতে জীবাত্মা আবির্ভূত হয়েছেন। জীবাত্মারা পরা প্রকৃতিতেই অবস্থান করেন। সেই জীবাত্মার একটু মানব শরীরের মধ্যে অন্তরাত্মা, হৃদ পুরুষ বা চৈত্য সত্তা নাম নিয়ে অবস্থান করছেন।

আমরা মানুষ, আমরা বিশুদ্ধ ও মিশ্র অখণ্ড একটি বস্তু নই। প্রকৃতির সকল স্তর আমাদের মধ্যে গ্রথিত, সৃষ্টির সকল স্রোতই আমাদের মধ্যে বহমান। প্রথমে দেহ, আর দেহকে সঞ্জীবিত করে রেখেছে জীবনী শক্তি বা প্রাণশক্তি। দ্বিতীয় মন, বুদ্ধি-বিচার-চিন্তা-ভাবুকতা প্রভৃতির খেলা এই ক্ষেত্রের। তৃতীয় অধ্যাত্মবোধ, যার স্বরূপ বিজ্ঞানময়, আনন্দময় যা অমৃতত্বের অধিষ্ঠান। দেহ ও প্রাণ নিয়ে মানুষের পশু ভাব, মন ও বুদ্ধি নিয়ে মানুষের মানুষ ভাব, আর তুরীয় জ্ঞান আনন্দ নিয়ে মানুষের দেব ভাব বা ভাগবত ভাব। বিবর্তন চক্রে প্রকৃতি মানুষকে প্রথমে পশু ভাবে, পরে মানুষ ভাবের মধ্য দিয়ে নিয়ে অগ্রসর হয়ে চলেছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের কিছু কিছু মানুষ দেব ভাবে আরোহণ করেছেন। যাঁদের কথা আমরা বিভিন্ন বইতে অথবা তাঁদের সংস্পর্শে এসেছিলেন যাঁরা, তাঁদের লেখনী থেকে জানতে পারি।

আমরা সাধারণ মানুষ। আমরা আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রিত করি মানুষের দৃষ্টি দিয়ে। মানবজীবনের কেন্দ্র হচ্ছে বুদ্ধি, এই বুদ্ধি দিয়েই আমরা স্থির করি কী ভালো কী মন্দ। বুদ্ধির দ্বারা, বিচার বিতর্কের দ্বারা আমরা সত্যকে পেতে চেষ্টা করি। মহাপুরুষেরা বলেছেন– মানুষের জীবন চারটি উপকরণে গঠিত– দেহ-প্রাণ-চিত্ত ও মন এবং বুদ্ধি (বুদ্ধি মনেরই একটি বিশেষ ক্রিয়া)। মানুষের অস্তিত্ব সম্বন্ধে জানতে পারি তার দেহ খানি দেখে। মানুষ কর্ম করে তার প্রাণ শক্তি বা জীবনী শক্তির সাহায্যে। মানুষ ভোগ করে চিত্তের সাহায্যে। মানুষ সব কিছু জানে মন দিয়ে। এইগুলিই মানুষের অজ্ঞানের দেহ-প্রাণ-মনের রাজ্য। মানুষের আরো একটি প্রকৃতি আছে। এটি অন্তরাত্মার, অধ্যাত্মসত্তার প্রকৃতি। মানুষের নিম্ন প্রকৃতির রাজ্যে রয়েছে সুখ-দুঃখ দ্বৈত ভালোমন্দের খেলা। অন্যদিকে ঊর্ধ্ব প্রকৃতিতে বা অধ্যাত্মসত্তায় রয়েছে জ্ঞান ও আনন্দের প্রাচুর্য।

(অষ্টবিংশ পর্ব আগামী রবিবার)

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন- 8584063724

২৬ম পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন- https://agamikalarab.com/

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s