ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-৩৬)

শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমায়ের জীবনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত এই ধারাবাহিকটি ইতিমধ্যে পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। আমাদের বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠকমণ্ডলীর মধ্যে শ্রী অরবিন্দ ও মায়ের জীবনী নিয়ে চর্চা করেন কিংবা শ্রী অরবিন্দ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত পাঠকও রয়েছেন নিশ্চয়ই। তাঁদের প্রতি আমাদের বিনম্র আবেদন যে, ধারাবাহিকটি পড়তে পড়তে কোনোরকম তথ্যভিত্তিক ত্রুটি চোখে পড়লে অনুগ্রহ করে তৎক্ষণাৎ আমাদের দপ্তরে যোগাযোগ করুন, অথবা লেখার শেষে কমেন্টেও জানাতে পারেন। এছাড়া লেখার নীচে দেওয়া লেখকের ফোন নম্বরে সরাসরি করতে পারেন যোগাযোগ। আমরা ত্রুটি মেরামতে সদা সচেষ্ট। –সম্পাাদক

কর্ম যোগ

মুকুল কুমার সাহা: এই পর্বে আমরা কর্ম যোগ সম্পর্কে কিছু আলোচনা করার চেষ্টা করছি। যেহেতু আমরা পুরাতন যোগ নিয়ে আলোচনা শুরু করেছি, সেই জন্য পুরাতন যোগ মার্গগুলির উদ্দেশ্য যা ছিল এবং বিভিন্ন যোগের যোগ পন্থাগুলি যে রকম ছিল ঠিক সেই রকম ভাবেই এই সমস্ত যোগগুলিকে জানতে চেষ্টা করেছি। যখন আমরা শ্রী অরবিন্দের পূর্ণ যোগ সম্পর্কে জানবার চেষ্টা করব, তখন তাঁর যোগের উদ্দেশ্য এবং তাঁর যোগপথে এই সব পুরাতন যোগপন্থার কতটুকু গ্রহণ করতে হবে, কতটুকু বর্জন করতে হবে, ঠিক কীভাবে তাঁর সাধকদের চলতে হবে, সেই সময়ে আমরা জেনে নিতে পারব।

এখন আমরা পুরাতন যোগ পন্থা অনুযায়ী কর্মযোগ সম্পর্কে কিছু জানবার চেষ্টা করছি। পূর্বে যে পর্বগুলোতে আমরা হঠযোগ, রাজ যোগ, জ্ঞান যোগ, ভক্তি যোগ সম্বন্ধে কিছু কিছু জেনেছি, সেই সবগুলি পুরাতন যোগপন্থারই বিভিন্ন পথ।

আমরা সাধারণ মানুষ সব সময়েই একটা না একটা কর্ম করে চলেছি। আমাদের সংসারের কাজ, লেখাপড়া, চাকরি, ব্যবসা, সমাজসেবা, দেশ সেবা প্রভৃতি। কর্ম ছাড়া আমাদের এক মুহূর্তও চলা সম্ভব নয়। আমাদের পিতা-মাতা, ভ্রাতা-ভগিনী, স্বামী-স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, আত্মীয়স্বজন, সমাজ-দেশ প্রভৃতি প্রত্যেকের প্রতি আমাদের যে কর্তব্য কর্ম বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন ধরনের সমস্ত প্রয়োজনীয় কর্তব্য-কর্ম করতে করতে আমরা জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছে যাই। কর্ম যোগ বলছে, এই সমস্ত কর্মের মধ্য দিয়েই কর্মযোগী ভগবানের সঙ্গে মিলিত হতে পারেন। গৃহস্থ আশ্রমে বাস করে কর্তব্য সম্পাদন করার একটা বিশেষ পদ্ধতি আছে, যাতে মন ক্রমে ক্রমে পবিত্র হয়ে পরমার্থ লাভের যোগ্য হতে পারে, এই পদ্ধতির নাম কর্ম যোগ। কর্ম যোগ সাংসারিক কর্মকে অধ্যাত্ম সাধনায় পরিণত করার এক অপূর্ব কৌশল।

আমরা সাধারণ ভাবে যে সমস্ত কর্ম করি, কর্ম মার্গ বলছে সে সবই ইহলোক বা পরলোকে সুখ বা দুঃখরূপ অবশ্যম্ভাবী ফল প্রসব করে। ইহাই কর্মের অমোঘ বিধান। তাই কর্মযোগীকে কর্ম করতে হবে কর্ম হতে মুক্ত হওয়ার জন্য। সেটা কী ভাবে সম্ভব হবে? আমরা সাধারণ ভাবে যে সব কর্ম করি সেটা আমাদের শরীর, প্রাণ, মন-বুদ্ধি ও অহং এর সাহায্যে বা আমাদের কাঁচা আমির প্রেরণায়। ফলে আমরা কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বদ্ধ জীবে পরিণত হই। তাই কর্মের নাশেই আমরা কৈবল্য মুক্তি লাভ করতে পারি। এই কর্মের নাশ সম্ভব হতে পারে কর্ম হতে বিমুখ হয়ে নয়, বরং কর্ম করেই কর্ম ক্ষয় করতে হবে।

আমাদের জীবনের প্রতিটি কর্ম, যে অবস্থায় যে পারিপার্শ্বিকের মধ্যেই সাধক থাকুক না কেন তদুচিত প্রত্যেক কর্তব্য কর্ম করতে হবে ভগবানকে উদ্দেশ্য করে। প্রত্যেক কর্মটি পুষ্পাঞ্জলীস্বরূপ ভগবানেরই চরণে নিবেদন করতে হবে, কোনো কর্ম করতে গিয়ে দেখতে হবে যেন উহার ফলাকাঙ্ক্ষায় মন অধীর হয়ে না পড়ে। লাভ-লোকসান, জয়-পরাজয়, কর্মের ফল যাই হোক না কেন, নির্বিকারে উহাকেই স্বীকার করতে হবে। এই ভাবে মনের সমতা রক্ষা করে সমস্ত কর্তব্য-কর্ম ভগবানের যজ্ঞ মূর্তিতে আহুতি প্রদান করতে হবে। এই ভাবে কর্ম করতে পারলে সমস্ত কর্ম ও কর্মের ফল ভস্মীভূত হয়ে যাবে। ভিতরে কর্মের বীজ নষ্ট হলেও যতদিন শরীর থাকবে, ততদিন পূর্ব সংস্কারের প্রেরণাবশত শরীর কিছুদিন কর্ম করেই চলবে, পরে শরীর পঞ্চভূতে মিলিয়ে গেলে সাধককে আর সংসারচক্রে ঘুরতে হয় না। তখন সাধক তাঁর স্বরূপে ফিরে যায়। তখনই সাধকের পূর্ণ সিদ্ধি।

(সপ্তত্রিংশ পর্ব আগামী রবিবার)

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন- 8584063724

৩৫ তম পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন– https://agamikalarab.com/2020/08/11/what-is-bhakti-yoga/

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s