ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-৪১)

শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমায়ের জীবনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত এই ধারাবাহিকটি ইতিমধ্যে পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। আমাদের বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠকমণ্ডলীর মধ্যে শ্রী অরবিন্দ ও মায়ের জীবনী নিয়ে চর্চা করেন কিংবা শ্রী অরবিন্দ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত পাঠকও রয়েছেন নিশ্চয়ই। তাঁদের প্রতি আমাদের বিনম্র আবেদন যে, ধারাবাহিকটি পড়তে পড়তে কোনোরকম তথ্যভিত্তিক ত্রুটি চোখে পড়লে অনুগ্রহ করে তৎক্ষণাৎ আমাদের দপ্তরে যোগাযোগ করুন, অথবা লেখার শেষে কমেন্টেও জানাতে পারেন। এছাড়া লেখার নীচে দেওয়া লেখকের ফোন নম্বরে সরাসরি করতে পারেন যোগাযোগ। আমরা ত্রুটি মেরামতে সদা সচেষ্ট। –সম্পাাদক

শ্রীঅরবিন্দের পূর্ণযোগ(পর্ব- ঘ)

মুকুল কুমার সাহা: শ্রীঅরবিন্দের লেখার বঙ্গানুবাদ থেকে আমরা জানতে পেরেছি প্রকৃতি কীভাবে তাঁর বড় বড় কাজগুলি সম্পন্ন করছেন, কীভাবে তিনি প্রেরণা দিয়ে বিভিন্ন ধরনের যোগগুলিকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। শ্রীঅরবিন্দ বলছেন, এতদিন পর্যন্ত এই সব বিভিন্ন ধরনের যোগগুলি মরমিয়া সম্প্রদায় ও তপস্বীর আশ্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন আমাদের ভবিষ্যৎজীবনের প্রয়োজনে এরা তপস্বীর আশ্রম থেকে বের হয়ে আসছে অনেকের মধ্যে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য। তিনি এটাও বললেন এই হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন ধরনের যোগ-পথগুলির পুনরাবিষ্কারের প্রয়োজন এবং এইসব যোগগুলির পরস্পরের মধ্যে সমন্বয়সাধনের দ্বারা নূতন ভাবে গঠন করে প্রয়োগ ব্যবস্থার উপায় বের করতে পারলে আমরা সাবলীলভাবে আমাদের অন্তরেরও ঊর্ধ্বে সর্বোত্তম সত্যের মধ্যে প্রবেশাধিকার পাব।

এরপর শ্রীঅরবিন্দ যোগ শব্দের অর্থ কী, সে সম্বন্ধে যা বলেছেন তাঁর নিজের কথা থেকেই আমরা জেনে নিই–“জীবন ও যোগকে সঠিক দৃষ্টিতে দেখলে জানা যায় যে সচেতন ভাবেই হোক আর অবচেতনভাবেই হোক, সমগ্র জীবন এক যোগ। কারণ, যোগ বলতে আমরা বুঝি এমন এক সুসংহত সাধনা যার লক্ষ্য হল আত্ম-সিদ্ধি, আর এই লক্ষ্যপ্রাপ্তির উপায় হল সত্তার অন্তঃস্থিত সব সুপ্ত শক্তির বিকাশ এবং মানবে ও বিশ্বে আমরা যে বিশ্বাত্মক ও বিশ্বাতীত সত্তার আংশিক প্রকাশ দেখি তার সঙ্গে ব্যষ্টি মানবের মিলন। বাহ্যজীবনের পিছনে তাকালে আমরা দেখি যে সমগ্র জীবন প্রকৃতির এক বিরাট যোগ, কারণ তার প্রয়াস হল তার সব গূঢ় শক্তির সদাবর্ধমান বিকাশের মাধ্যমে স্বীয় সিদ্ধিলাভ ও স্বীয় দিব্যসত্তার সঙ্গে মিলন সাধন। ক্ষিপ্রতা ও বীর্যের সঙ্গে এই মহান উদ্দেশ্য সাধনের জন্য প্রকৃতি এই পৃথিবীতে প্রথমে মনোময় মানুষের মাঝে কার্যের আত্মসচেতন উপায় ও সংকল্পিত ব্যবস্থা উদ্ভাবন করে। যেমন স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন– যোগকে বলা যায় এমন এক সংকুচিত উপায় যাতে এক দৈহিক জীবনের মধ্যেই বা কয়েক বৎসর বা কয়েক মাসের মধ্যেই নিজের ক্রমবিকাশ সম্পূর্ণ করা যায়। প্রকৃতিমাতা তাঁর বিরাট ঊর্ধ্বগামী কর্মে বিভিন্ন সর্বজনীন পদ্ধতি অবলম্বন করে আসছেন, তবে তাঁর গতি মন্থর, প্রয়োগ শিথিল ও ব্যাপক, মনে হয় শক্তি ও উপাদানের প্রভূত অপচয় হচ্ছে, কিন্তু এতে সংহতি দৃঢ় হয়। সব যোগ সাধনাই প্রকৃতির এইসব পদ্ধতির কোনো না কোনো অংশ বা তাদের সংকুচিত সমাহার যা প্রয়োগ করা হয় সঙ্কীর্ণ রূপের মধ্যে, তবে আরো তীব্র ও প্রখরভাবে। একমাত্র যোগের এই তত্ত্বজ্ঞানই বিভিন্ন যোগপন্থার দৃঢ় ও যুক্তিযুক্ত সমন্বয় গঠনের ভিত্তি হতে পারে। কারণ তখন আর মনে হবে না যে যোগ রহস্যময় অপ্রাকৃত কিছু যা বিশ্বশক্তির সাধারণ ক্রিয়াপ্রণালীর সঙ্গে সম্পর্কশূন্য; আবার প্রকৃতির প্রত্যক্ ও পরাক্ আত্মসার্থকতার দুই মহতি ধারার উদ্দেশ্যের সঙ্গে যোগের যে কোনো সম্বন্ধ নেই, তাও মনে হবে না। বরং মনে হবে যে কম উন্নত কিন্তু আরো ব্যাপক ক্রিয়ায় প্রকৃতির যে সব শক্তি ইতিমধ্যেই প্রকাশ হয়েছে বা উত্তরোত্তর সংহত হচ্ছে, এইসব শক্তিরই প্রখর ও অসামান্য প্রয়োগ হল যোগ। …”

“…কোনো মানুষ অন্তরের দিকে তার দৃষ্টি ও শক্তি ফিরিয়ে যোগের পথে এলে ধরে নেওয়া হয় যে সমষ্টি জীবনের মহাস্রোত এবং মানবজাতির ঐহিক কার্য থেকে তার বিদায় অনিবার্য। এই ধারণা এত প্রবল এবং প্রচলিত দর্শন ও ধর্মে এর উপর এত জোর দেওয়া হয়েছে যে সাধারণত মনে করা হয় যে জীবন থেকে পলায়ন শুধু যে যোগের পক্ষে অপরিহার্য তা নয়, সেটি যোগের সাধারণ উদ্দেশ্যও বটে। মুক্ত ও সিদ্ধ মানবজীবনের ভগবান ও প্রকৃতির পুনর্মিলনসাধন যে যোগ সমন্বয়ের উদ্দেশ্য নয় বা যার পদ্ধতি এমন যাতে আমাদের আন্তর এবং বাহ্যকর্ম ও অভিজ্ঞতাগুলিকে তাদের দুইয়েরই দিব্য পূর্ণতার মধ্যে সুসংগত করার অনুমতি ও উপরন্তু অনুমোদন নেই– এমন কোনো যোগসমন্বয়ই সন্তোষজনক হতে পারে না। মানুষ হল এই জড় জগতে অবতীর্ণ এক উচ্চতর সত্তার ঠিক সেই সংজ্ঞা ও প্রতীক যাতে নিম্নের পক্ষে নিজেকে রূপান্তরিত করে ঊর্ধ্বের ধর্মলাভ এবং নিম্নের রূপে ঊর্ধের আত্মপ্রকাশ সম্ভব। এই সম্ভাবনাকে কার্যে পরিণত করার জন্য তাকে যে জীবন দেওয়া হয়েছে তা এড়িয়ে যাওয়া কখনোই তার পরম সাধনার বা আত্মসার্থকতার বলবত্তম উপায়ে অপরিহার্য শর্ত বা সমগ্র ও চরম উদ্দেশ্য হতে পারে না। শুধু কোনো কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে সাময়িক ভাবে এর আবশ্যকতা থাকতে পারে বা তা মানবজাতির মহত্তর সাধারণ সম্ভাবনার প্রস্তুতির জন্য ব্যক্তিবিশেষের বিশেষ আত্যন্তিক সাধনা হতে পারে। প্রকৃতির অবচেতন যোগের মত যখন মানুষের সচেতন যোগ জীবনের সঙ্গে বাহ্যত সমপরিধি হয় তখনই যোগের সত্যকার পূর্ণ উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা সিদ্ধ হয়; আর তখনই আমরা পথ ও সিদ্ধির পানে চেয়ে আর একবার, তবে আরো পূর্ণ ও দীপ্ত অর্থে বলতে পারি ‘সমগ্র জীবনই যোগ।”

(বিয়াল্লিশতম পর্ব আগামী রবিবার)

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন- 8584063724

৪০ তম পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন- https://agamikalarab.wordpress.com/2020/11/10/purna-yoga-of-shree-aurobindapart-3/

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s